বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবং গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের সাবেক প্রথম মেয়র অধ্যাপক এম এ মান্নান (৭২) ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি — রাজিউন)। রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহষ্পতিবার বিকেলে ৪টা ৩৫ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেন। শুক্রবার জানাযা শেষে পারিবারিক গোরস্থানে তাকে বাবা-মা ও স্ত্রীর কবরের পাশে দাফন করা হবে। মরহুমের একমাত্র ছেলে মঞ্জুরুল করিম রনি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

পারিবারিক ও দলীয় সূত্র জানায়, অধ্যাপক এমএ মান্নান দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে ভুগছিলেন। বুধবার রাতে তাকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাতেই অবস্থার অবনতি হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন (বৃহষ্পতিবার) বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তিনি একমাত্র সন্তান মঞ্জুরুল করিম রনিসহ বহু আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার মৃত্যুর প্রায় দুই বছর আগে তার স্ত্রী সাজেদা মান্নান কিডনী জটিলতার কারণে ইন্তেকাল করেন।

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর (১৯ নং ওয়ার্ড) ও বিএনপি নেতা তানভীর আহমেদ জানান, গাজীপুর মহানগরীর দক্ষিণ সালনা এলাকায় এমএ মান্নান জন্ম গ্রহণ করেন। অধ্যাপক মান্নানের প্রথম জানাযা শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার জাতীয় সংসদ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর পল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে দ্বিতীয় জানাযা অনুষ্ঠিত হবে। পরে বাদ জুম্মা নিজ জেলা গাজীপুর শহরের ভাওয়াল রাজবাড়ি মাঠে তৃতীয় জানাযা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর বিকেলে বাদ আছর মহানগরীর সালনা নাসির উদ্দিন মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তার চতুর্থ জানাযা অনুষ্ঠিত হবে। পরে স্থানীয় দক্ষিণ সালনা এলাকার পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মা ও স্ত্রীর কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হবে।

১৯৫০ সালে গাজীপুর জেলা সদরের দক্ষিণ সালনা এলাকায় এমএ মান্নান জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম কছিম উদ্দিন আকন। তিনি সালনা প্রাইমারি স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন জয়দেবপুর রানী বিলাসমণি স্কুলে। সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণি পড়েন ময়মনসিংহ মুসলিম হাই স্কুলে এরপর নবম ও দশম শ্রেণি ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে পড়ে এসএসসি পাস করেন। কলেজ জীবনের এইচএসসি ও ডিগ্রি পাস করেন ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ থেকে। এভাবেই ময়মনসিংহের শিক্ষাজীবন শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত রসায়নে এমএসসিতে ভর্তি হন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে টঙ্গী কলেজে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু। তখন থেকেই শিক্ষকতার পাশাপাশি রাজনীতি ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে নিজেকে সক্রিয় রেখেছেন। টঙ্গী কলেজ ছেড়ে পরে তিনি গাজীপুরের কাজী আজিম উদ্দিন কলেজের শিক্ষকতায় যোগদান করেন।

রাজনীতি:
দীর্ঘ বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে তিনি দলের সদস্য থেকে শুরু করে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং বর্তমানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। মান্নানের রাজনৈতিক উত্থান শুরু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন থেকে। অবশ্য এর আগে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে দলীয়ভাবে সালনা গ্রাম সরকার প্রধানের দায়িত্ব পান তিনি। পরে জাতীয় গ্রাম সরকারের কেন্দ্রীয় সদস্য সচিবেরও দায়িত্বে ছিলেন। অধ্যাপক মান্নান প্রথম’ ৮৪ সালে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কাউলতিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরে আরও পরপর চার বার তিনি ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচন করে বিজয়ী হন।

১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-২ (গাজীপুর সদর ও টঙ্গী) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মান্নান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দেশের সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়ে তিনি তৎকালীন ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে নবগঠিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
২০১৩ সালে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক এমএ মান্নান গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে যাত্রীবাহীবাসে পেট্রোলবোমা হামলার মামলায় ওই বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকার বারিধারার ডিওএইচএস’র নিজ বাসা থেকে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের (জিসিসি) মেয়র ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অধ্যাপক এম এ মান্নানকে গ্রেফতার করে পুলিশ। জয়দেবপুর থানার একটি ফৌজদারি মামলায় মান্নানের বিরুদ্ধে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র ২০১৫ সালের ১২ মে গাজীপুরের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিমের আদালতে গৃহীত হওয়ায় ওই বছরের ১৯ আগস্ট স্থানীয় সরকার বিভাগ তাকে মেয়র পদ থেকে প্রথমবারের মতো সাময়িক বরখাস্ত করে। এর বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের ২৮ মাস পর মেয়র পদ ফিরে পান এম এ মান্নান। কিন্তু এর পরপরই আরো একটি মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণ করা হলে ২০১৬ সালের ১৮ এপ্রিল দ্বিতীয়বারের মতো তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ওই আদেশের বিরুদ্ধেও আইনি লড়াই করেন মান্নান। ২০১৭ সালের ১৮ জুন পুনরায় মেয়র পদ ফিরে পান তিনি। কিন্তু এর কয়েকদিনের মধ্যে দুর্নীতির একটি মামলায় অভিযোগপত্র আদালতে গৃহীত হওয়ায় মেয়রের দায়িত্ব নেয়ার ১৯ দিনের মাথায় অর্থাৎ গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৪র্থ বছর পূর্তির দিন ২০১৭ সালের ৬ জুলাই অধ্যাপক এমএ মান্নানকে মেয়রের পদ থেকে ফের সাময়িক বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। ওই আদেশেরও বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি। মেয়র মান্নানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে প্রায় ৩০টি মামলা দায়ের করা হয়। মেয়র পদে তার ৫ বছর মেয়াদকালে তিনি ২৮ মাস কারাগারে ছিলেন।