ঈদের আগের দিন (রবিবার) কালিয়াকৈরের সিনাবহ ও বাঘাম্বর এলাকার আড়াই শতাধিক ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে ঢাকার বন বিভাগ। এসকাভেটর (মাটি কাটার যন্ত্র) নিয়ে হঠাৎ অভিযান চালিয়ে এসব ঘরবাড়ি ও স্থাপনা ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে গৃহহীন হয়ে খোলা আকাশের নিচে মশারি টানিয়ে রাতযাপন করছেন তারা। ঘরবাড়ি ও রান্নাঘর ভেঙে ফেলায় ঈদের দিনও অনেকের জোটেনি খাবার ।

বন বিভাগ, পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত রবিবার গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বনভ’মি থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত উপজেলার চন্দ্রা রেঞ্জের সিনাবহ ও বাঘাম্বর এলাকায় এ অভিযান চালিয়ে ঘরবাড়িসহ আড়াই শতাধিক স্থাপনা ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়ে উচ্ছেদ করা হয়। যৌথ বাহিনীর সহযোগিতায় ঢাকা বন বিভাগের উদ্যোগে চারটি এসকাভেটর নিয়ে এ অভিযান পরিচালিত হয়। ঈদের আগেরদিন হঠাৎ এ অভিযানে ঘরবাড়ি ভেঙ্গে দেয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়ে স্থানীয় বাসিন্দারা। একপর্যায়ে উত্তেজিত লোকজনের সঙ্গে বন বিভাগের কর্মীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। এসময় বনবিভাগের কয়েক কর্মীকে নাজেহাল করে স্থানীয়রা। এতে অন্তত ১০ জন আহত হন। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

বাঘাম্বর এলাকার আসমা বেগম বলেন, আমরা বন বিভাগের লোকদের সঙ্গে আলোচনা করেই ঘর বাড়ি তৈরি করেছি। তাদের টাকাপয়সাও দিয়েছি। অথচ হঠাৎ ঈদেও আগেরদিন আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দিয়ে ঈদের আনন্দ কেড়ে নিল তারা।

কবির হোসেন নামের এক ব্যক্তি বলেন, আমরা ভূমিহীন। আমরা প্রায় ৩০-৪০ বছর ধরে এই এলাকায় বসবাস করছি। হঠাৎ অভিযান চালিয়ে আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন কোনো রকমে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছি। কী অপরাধ ছিল আমাগো।

সিনাবাহ বাজারের ব্যবসায়ী আবদুস সালাম বলেন, প্রায় ৪০ বছর ধরে এখানে দোকান নির্মাণ করে ব্যবসা করে আসছেন। নিয়মিত সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্স দিচ্ছেন। দোকানে ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকার মালামাল ছিল। সেই মালামাল বের করার সময়ও দেয়নি। অপর ব্যবসায়ী আবু হানিফ বলেন, ‘মালামালসহ দোকানঘর ভেঙে দিয়েছে। এখন একেবারে পথে বসে গেছি।’

এদিকে উচ্ছেদ অভিযানের পর ওই দুই এলাকা যেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সবক’টি ঘরবাড়ি ও স্থাপনা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। টিনের ও আধা পাকা ঘরের রান্না করার চ’লা, হাঁড়ি-পাতিলসহ মেঝেগুলো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। অভিযানে শুধু বাড়িঘর নয়, দীর্ঘদিনের বড় বড় কাঁঠালগাছসহ বিভিন্ন ফলের গাছের শিকড় থেকে তুলে ফেলা হয়েছে। নষ্ট করা হয়েছে চাল ডালসহ খাদ্য সামগ্রী। ভেঙ্গে দেওয়া ঘরবাড়ির ভিতরেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে খাট ও আলমারিসহ ঘরের আসবাবপত্র ও মালামাল আছে। ভাঙা ঘরের ভেতরে মশারি টানিয়ে রাতযাপন করেছেন শিশু ও বয়স্কসহ স্থানীয় বাসিন্দারা। চ’লা ও হাঁড়ি পাতিলের অভাবে কারও বাড়িতেই রান্না নেই। অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন তারা।

মঙ্গলবার দুপুরে বিপদগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ত্রাণসহায়তা দিয়েছেন কালিয়াকৈর পৌর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইজুদ্দিন আহাম্মেদ। তিনি বলেন, যে পরিমাণ ত্রাণসহায়তা দেওয়া হয়েছে, আশা করছি, আগামী ১৫-১৬ দিন তাঁরা ভালোভাবে কাটিয়ে দিতে পারবেন। প্রয়োজনে আরও সহায়তা দেওয়া হবে।

ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) বশিরুল আল মামুন বলেন, কালিয়াকৈরসহ বিভিন্ন এলাকায় গত ৫ আগস্টের পর অসাধু কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় বন বিভাগের জমি দখল করে হাজার হাজার ঘরবাড়ি ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই দোতলা ভবন, কেউ টিনশেড, আবার কেউ আধা পাকা ঘর নির্মাণ করেছেন। স্থানীয় অসাধু ব্যক্তিরা অবৈধভাবে ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন। কয়েক মাস ধরেই বন বিভাগের লোকজন মাইকিং করে এসব অবৈধ স্থাপনা ভেঙে সরিয়ে নেওয়ার জন্য বলেছেন, কিন্তু কেউ এ বিষয়ে কর্ণপাত করেননি। অবশেষে বাধ্য হয়ে গত রবিবার সকালে যৌথ বাহিনীর সহযোগিতায় চারটি এক্সকাভেটর দিয়ে উপজেলার সিনাবহ ও বাঘাম্বর এলাকায় ঘরবাড়ি ভাঙা শুরু করা হয়। এ সময় স্থানীয় লোকজন সংঘবদ্ধ হয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ওপর ইটপাটকেল ছোড়েন। এতে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। বিকেল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে আড়াই শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বনভূমি পুনরুদ্ধারে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে।