নির্বাচন ও সংস্কার নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ‘আমরা কখনোই বলিনি আগে নির্বাচন পরে সংস্কার। এটা ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। আমরা বলেছি, নির্বাচন সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে ন্যূনতম যে সংস্কার করা দরকার সেটা করতে হবে।’
আজ বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায় নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘যারা সংস্কারে এসেছেন, খুব জ্ঞানী মানুষ, পণ্ডিত লোক, বিশাল বিশাল ইউনিভার্সিটি থেকে ডিগ্রি করে এসেছেন এবং তারা দিচ্ছেন। তাদেরকে আমরা শ্রদ্ধা করি এবং সম্মানও করি। কিন্তু তারা যদি জনগণের বাইরে গিয়ে কিছু (সংস্কার) করেন তাহলে ‘‘সরি টু সে’’ আমরা সেটাকে সমর্থন করতে পারব না। জনগণ যেটা চাইবে আমরা সেটাকে সমর্থন করব।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘গণতন্ত্রকে বাদ দিয়ে বহুত্ববাদ, এটা আমাদের দেশের কয়টা লোক বুঝে আপনারাই বলেন? বহুত্ববাদ বলতে মাল্টিলেকট্রাটিটিভ তাই না, কয়টা লোক বুঝে, কয়টা লোক ইউনিভার্সিটি থেকে পিএসডি করে আসছে বলেন আমাকে? সংস্কার কারা করছে, ইনফর্মগুলো কারা আনছে? এই দেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক কাদের, রাজনৈতিক দলগুলোর তাই না। এখানে জামায়াত হোক, বিএনপি হোক, আওয়ামী লীগ হোক, জাতীয় পার্টি-জাকের পার্টি হোক, সিপিসি হোক বা ছাত্রদের নতুন সংগঠক হোক তাদের সম্পর্ক জনগণের সঙ্গে।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপিকে টার্গেট করে একটা জিনিস প্রচারণা করা হচ্ছে। যেটা সবচেয়ে বেশি প্রচারণা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়াতে বেশি যে বিএনপি আগে নির্বাচন চায়, তারপর সংস্কার চায় অথবা সংস্কার চায় না নির্বাচন চায়। আমি আপনাদের সামনে খুব পরিষ্কার করে বলছি, এটা একটা ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি করা হচ্ছে জনগণের মধ্যে। আমরা বারবার করে এ কথাটাই বলছি- আমরাই তো সংস্কারের প্রবক্তা, আমরাই সংস্কার চেয়েছি।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমরা আমাদের ৩১ দফা যেটা দিয়েছি সেটার সঙ্গে সরকারের সংস্কারের উদ্যোগের মধ্যে একটাও দেখবেন না যে একটা অমিল আছে। আর কতগুলো বিষয় আছে সংবিধানের সংস্কারের বিষয়ে সেখানে আমরা সুস্পষ্টভাবে আমাদের মতামত আমরা দিয়েছি। কতগুলো বিষয় আছে যেগুলো মীমাংসিত, সে বিষয়গুলোতে আমরা হাত দিতে চাই না।’
ফখরুল বলেন, ‘গণতন্ত্রের বিউটি হচ্ছে যেখানে আপনার ভিন্ন মত থাকবে, প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলের যদি একি মত থাকে তাহলে একি হয়ে গেল। এখানে একেক জনের একেক মত থাকবে, ভিন্ন মত থাকবে। আর জনগণ বেছে নেবে কোনটা তাদের জন্য উপযুক্ত, এ কারণেই তো নির্বাচন।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কেন- আমি আমার মেন্যু-ফেস্টুন নিয়ে জনগণের কাছে যাব, আমি আপনার যে কাজগুলো করতে চাই সেই কাজগুলো নিয়ে আমার বিভিন্ন পলিসি নিয়ে জনগণের কাছে এবং বলব এগুলো আমার পলিসি আপনারা আমাকে ভোট দিন। অন্যান্য দলগুলো তাদের পলিসি নিয়ে যাবে। জনগণ যাদের ভোট দেবে তারাই সরকার গঠন করবে এবং তারাই পার্লামেন্ট গঠন করবে। এটাই হচ্ছে গণতন্ত্র।’
কিছু সংস্কার তো প্রয়োজন হবেই উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘সংস্কার হবে, সংস্কার যখন হওয়ার তখন হবে। এখানে সংস্কারের সঙ্গে নির্বাচনের কোনো পার্থক্য নেই। যে কথাটা আমরা বলতে চেষ্টা করি, হয়তো বোঝাতে পারি না অথবা আপনারা বোঝেন না অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে বোঝেন না এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে চান অনেকেই; সেই জায়গাগুলোতে সমস্যা।’
তিনি বলেন, ‘একটা অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্যে মিনিমাম যে সংস্কার দরকার সেগুলো করতে হবে। নির্বাচন ব্যবস্থা কেন্দ্রীক যে সংস্কার যেমন নির্বাচন কমিশন, নির্বাচন ব্যবস্থা এটা করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এটা করতে হবে, জুডিসিয়াল রিফর্ম এটা অবশ্যই করতে হবে। এই তিনটা মাস্ট, সরকার ৬টা সংস্কার কমিশন করেছে, ৬টার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই তিনটা। এই তিনটা তো আমরা সংস্কার করতে বলেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা নিশ্চয়ই জানেন- সরকারের প্রত্যেকটা সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে আমরা প্রত্যেকটা ক্রস বাই ক্রস তাদের জবাব দিয়েছি এবং সেটার উত্তর দিয়েছি। আর তাদেরকে অনুরোধ করেছি এই বিষয়ে আমরা কথা বলতে চাই, সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই বিষয়গুলো নিয়ে তারা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলবে, কথা বললে তখন সেটা হবে।’
‘আমরা যে বিষয়টার ওপর জোর দিচ্ছি যেটা বুঝতে অনেকেই অক্ষম হচ্ছেন, আমরা কখনই এই কথা বলিনি যে আমরা আগে নির্বাচন পরে সংস্কার; এটা যদি কেউ বলে থাকে তাহলে ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। আমরা বলছি, নির্বাচন সুষ্ঠ-অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নূন্যতম যে সংস্কারগুলো করা দরকার সেগুলো করতে হবে’, যোগ করেন বিএনপি মহাসচিব।
ফখরুল বলেন, ‘আপনারা একটা জিনিস ভুলে যাচ্ছেন কেন সংস্কারের দাবি তো আমাদের। ২০১৬ সালে আমাদের ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) ভিশন ২০-৩০ তে আমরা আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার যে পরিবর্তনগুলো করা দরকার সেই কথাগুলো আমরা তখনই বলেছি। আজকে আপনার দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্টের কথা উঠছে এবং সংস্কার কমিশন তারাও বলছে এটা করতে হবে, এটা তো আমরা তখনই বলেছি। আপনার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ৯ মাসের মধ্যে নির্বাচন সেটা কিন্তু আমরা তখনই বলেছি। তাহলে কি বোঝা যাচ্ছে, আমরা যা বলেছি সেটাই তো এখন আসছে। তাহলে সমস্যাটা কোথায়?’
তিনি বলেন, ‘যেটা যেটা বাস্তবায়ন যোগ্য সেটা বাস্তবায়ন হবে, অল কনসেপ্ট যদি হয় সবগুলো দলের, আর যেগুলো বাকি থাকবে সেগুলো পরবর্তী সরকার করবে। এটা তো সরকারেই কথা, ইউনূস সাহেবেরই কথা।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কেউ যদি ফলো করে সেখানে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে না। আপনারা যদি ভালো করে দেখেন গোটা পৃথিবীতে ডানপন্থীদের একটা উত্থান হয়েছে এবং তারাই বলছেন যে- গণতন্ত্র ইস গোয়িং ডাউন। কিছুদিন আগে বাংলাদেশে জাতিসংঘের মহাসচিব এসেছিলেন, উনার সঙ্গে আমাদের একটা এক্সক্লুসিভ মিটিং হয়েছিল কয়েকটা রাজনৈতিক দল ও সংস্কার কমিশনের। সেখানে তিনি নিজেই বলেছিলেন গণতন্ত্র এখন খুব বিপদের সম্মুখে। বিভিন্ন দেশে ডান পন্থীদের উত্থান হচ্ছে, কর্তৃত্ববাদের উত্থান হচ্ছে, গণতন্ত্র নিচে নামছে। তারপরেও গণতন্ত্র হচ্ছে শ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা শাসনের জন্যে, সুশাসনের জন্যে, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যে।’
‘এই যে আমরা একটা জুজুর ভয়ে থাকি যে- রাজনৈতিক দলগুলো স্বৈরাচার হয়ে ওঠে, স্বৈরাচার হয়ে উঠলে তো আওয়ামী লীগের মতো সিস্টেম, আমাদের দেশের কালচার অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার বেস্ট সিস্টেম। তা না হলে আওয়ামী লীগের মতো স্বৈরাচার-ফ্যাসিবাদের উত্থান হবে। আমাদের সময় সেই ধরনের স্বৈরাচার-ফ্যাসিবাদ বা কর্তৃত্ববাদের উত্থান হয়নি,’ যোগ করেন বিএনপির এই নেতা।
ফখরুল বলেন, রাষ্ট্র যখন চালায় একটা দলকে তখন কিছু কিছু কাজ করতে হয়, আর সবসময় সেগুলো জনপ্রিয় হয় তা না, অনেক সময় সেগুলো অজনপ্রিয় হতে পারে।
এ সময় ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ওবায়দুল্লাহ মাসুদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী, পৌর বিএনপির সভাপতি শরিফুল ইসলাম শরতরাং এটার জন্য জনগণের কোনো দোষ নেই। গণতন্ত্র সবচেয়ে উত্তম ব্যবস্থা।’