১৩ বছর আগের হামলার ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সাবেক উপ-উপাচার্য ও সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়া, সহকারী প্রক্টর তারেক নূর ও অধ্যাপক মুসতাক আহমেদসহ সাবেক ৬ ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। গতকাল সোমবার রাজশাহী কোর্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী হাসান ইলিয়াসের পক্ষে তার ছোট ভাই রোকনুজ্জামান এই মামলা করেন।

আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনের বারান্দায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাদী এ তথ্য জানান।

মামলায় রাবির তিন শিক্ষক ছাড়াও অন্যান্য আসামিরা হলেন, নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের তৎকালীন রাবি শাখার সাবেক সভাপতি ও সদ্য বিলুপ্ত হওয়া নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আহম্মদ আলী ওরফে আহম্মদ আলী মোল্লা (৪২), তৎকালীন রাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবু হোসাইন ওরফে আবু হোসাইন বিপু (৩৭)। তৎকালীন মাদার বখ্শ হল শাখা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক ও বর্তমান তেজগাঁও শিল্প অঞ্চল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ রুহুল আমিন বাবু (৩৮), তৎকালীন রাবি শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ও বর্তমান গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আল আরাফাত রাব্বি (৩৪), তৎকালীন ছাত্রলীগের নেতা ও রাবির ২০০৩-২০০৪ সেশনের ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল আলিম (৩৫) ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান ২০০৭-২০০৮ সেশনের কামাল হোসেন (৩৫)।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মামলার বাদী রোকনুজ্জামান বলেন, ‘ভুক্তভোগী ছাত্র সরদার হাসান ইলিয়াস ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে রাবির আরবি বিভাগের ছাত্র ছিলেন। তিনি সাতক্ষীরা জেলার দেবহাটা থানার দক্ষিণ কুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা। রাবি প্রেসক্লাবের সাবেক সহ-সভাপতি ও বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গ্লোবাল কমিউনিটির সদস্য। ২০১১ সালের ১৪ আগস্ট আনুমানিক দুপুর ২টায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ আমীর আলী হলের স্টোর রুম থেকে ককটেল উদ্ধারের সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে পরিকল্পিতভাবে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী বাহিনী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে আমার বড় ভাইকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার ওপর বর্বরোচিত আক্রমণ করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন দেশে আইনের শাসন না থাকায় মামলা করতে বিলম্ব হয়েছে। এ ছাড়া আমার ভাই ব্যক্তিগত কাজে দেশের বাইরে থাকায় তার পক্ষে মামলাটি আমি করেছি। আমি আদালতের কাছে আমার ভাইয়াকে হত্যাচেষ্টাকারী আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।’

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, সে সময় আসামি রুহুল আমিন বাবু (বর্তমান পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর) হকিস্টিক দিয়ে সরদার হাসান ইলিয়াসকে বেধড়ক পিটিয়ে জখম করে। পরে ইট দিয়ে তার মাথা ও মুখে আঘাত করে রক্তাক্ত করে। আমীর আলী হলের সামনে থাকা পানির কুয়ার মধ্যে ফেলে চুবিয়ে তাকে ধরে রাখে। ওই সময় পানি থেকে উঠিয়ে আসামি আব্দুল আলীম, আল আরাফাত রাব্বি ও আহম্মদ আলী মোল্লা জিআই পাইপ ও আবু হোসাইন বিপু রড দিয়ে ভুক্তভোগীর পিঠে, কোমরে ও পায়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকে। এ সময় ভুক্তভোগীর পকেটে থাকা মোবাইল ফোন আসামি কামাল হোসেন ও হাতে থাকা ক্যামেরা আহম্মদ আলী মোল্লা ছিনিয়ে নেয়।

এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর (পরে উপ-উপাচার্য) চৌধুরী মোহাম্মদ জাকারিয়া, সহকারী প্রক্টর তারেক নূর ও মুসতাক আহমেদ। তারা কোনো সাহায্য করেননি বরং ভুক্তভোগীর ওপর হামলা করার জন্য নির্দেশ দেন। তাদের মৌন সম্মতি পেয়ে দ্বিতীয়বার রড ও হকিস্টিক দিয়ে সাংবাদিক সরদার হাসান ইলিয়াসকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা শরীরের সর্ব শক্তি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকে। নির্যাতনের এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তাকে মৃত ভেবে আসামিরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পরে মুমূর্ষু অবস্থায় সহকর্মী সাংবাদিকরা তাকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছয় নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করেন।

সংবাদ সম্মেলনে বলা তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী জেলা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আমলি আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে আগামী বছর ৭ জানুয়ারির মধ্যে মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মালেক বলেন, ‘এই মামলার বিষয়ে আমরা এখনো অবগত নই। আমরা কোনো কাগজপত্র এখনো হাতে পাইনি।’

বাদীপক্ষের আইনজীবী জয়নাল আবেদীন জুয়েল বলেন, ‘মামলাটি আদালতে গ্রহণ করা হয়েছে। তদন্তের জন্য ফাইল পাঠানো হয়েছে। দু-একদিনের মধ্যে এটা মতিহার থানায় চলে যাবে।’