তিস্তা নদীর বামতীরে বাঁধ নির্মাণ না করায় প্রতিবছরেই, বন্যায় ভারতের উজান থেকে নামে আসা পাহাড়ি ঢল আর প্রবল বর্ষনে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়নটি। এতে অধিকাংশ রাস্তাঘাট, ব্রিজ – কালভাট, ফসলি জমি বিনষ্ট হয়ে যায় এবং বন্যার পানির প্রবল স্রোতে শতাধিক বাড়িঘর ভেঙ্গে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। অনেক বসতভিটা নদীগর্ভে বিলিন হয়ে যায়। আক্রান্ত রাস্তাঘাট গুলো শাখা নদীতে পরিণত হয়েছে। তাই তিস্তার বামতীরে বাধ নির্মাণ হচ্ছে যুগযুগ ধরে লক্ষলক্ষ বানভাসি মানুষের প্রাণের দাবি।
তিস্তা নদীর বাধতীরে ৭-৮কিলোমিটার একটি বাধ নির্মাণ করলেই বন্যার কড়াল গ্রাস নদী ভাঙ্গন, ফলস বিনষ্টসহ বিভিন্ন ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবে লালমনিরহাট জেলার ৫টি উপজেলার প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ। তা
বন্যার পানি ধীরে-ধীরে সরে যাচ্ছে। সেই সাথে ভেসে উঠছে বন্যায় রেখে যাওয়া ভয়াল চিত্র। তছনছ হয়ে পরে আছে ঘরবাড়ি। তিস্তা ও ধরলার নদীর পানি কমতে শুরু করলেও লোকজনের ভোগান্তির যেন শেষ নেই। রাস্তা ঘাটের বেহাল দশায় বেড়েই চলেছে ভোগান্তি। আশ্রয় কেন্দ্র থেকে আশ্রিত পরিবারগুলো নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে আবারও বন্যায় আশংকায় দিন কাটাচ্ছেন তিস্তা পাড়ের মানুষের।
এদিকে বন্যার পানিতে প্রাথমিক বিদ্যালয় ডুবে যাওয়ায় লালমনরিহাটের দুইটি উপজলোর ৩২৫ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সাময়কি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। এর মধ্য লালমনিরহাট সদর উপজলোয় ১৪৮ টি ও হাতীবান্ধা উপজলোয় ১৭৭ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আগামী ১৯ আগস্ট থেকে দ্বিতীয় সাময়কি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
সরেজমিনে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, ঐ ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের গুচ্ছগ্রাম ও তালেব মোড় বাজারের কয়েকটি দোকান বন্যার পানির প্রবল স্রোতে নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। একই অবস্থা হয়েছে পার্শ্ববর্তী সিঙ্গিমারী ইউনিয়নের ভেশ্বির মোড় এলাকায় ১৭টি বসতভিটা।
তালেব মোড় হতে গড্ডিমারী মেডিকেল এবং বড়খাতাগামী পাকা রাস্তাটির অধিকাংশ যায়গা পানির স্রোতে ভেঙ্গে নদীর নালায় পরিনত হয়। এছাড়াও ঐ এলাকা থেকে হাতীবান্ধাগামী পাকা রাস্তাটি বন্যার পানির স্রোতে ৭০% ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গড্ডিমারী ইউনিয়ন পরিষদ হতে মিলনবাজার গামী রাস্তাটির একটি ব্রিজের উভয়পার্শ্বে দুইশত ফিট করে চারশত ফিট পানির স্রোতে বিলিন হয়ে যায়। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, নদীর মাঝ খানে একটি ব্রিজ দাঁড়িয়ে আছে।
কয়েকশ পুকুর, মৎস্য খামার এবং প্রজেক্টের মাছ ভেসে যায় বন্যার পানিতে। শতশত হেক্টর জমির আমন ধান বন্যায় পানিতে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে মাথায় হাত পড়ে মৎস্য চাষি এবং কৃষক কুলে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিলিন হওয়ার কারণে বিপাকে পড়েছে স্কুল, কলেজ, শহর বন্দরগামীরা।
এছাড়াও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয় ঐ উপজেলার সানিয়াজান, সিঙ্গিমারী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া ও ডাউয়াবারী ইউনিয়নের রাস্তাঘাট, আবাদি জমি, পুকুর, মৎস্য খামার গুলো।
হাতীবান্ধার গড্ডিমারী ইউনিয়নের শাহ্ আলম (৩৫) এর বাড়ি ভিটে সহ নদীতে বিলিন হলে থাকার জায়গা না পেয়ে পাকারাস্তার উপর টিনের চালা করে বসবাস করছে।
সানিয়াজান ইউনিয়নের দোয়ানির মোর এলাকার রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ৫০-৬০টি বাড়ি বন্যার পানির স্রোতে নদীগর্ভে বিলিন হয়।
সিঙ্গিমারী ইউনিয়নের ভেশ্বির মোড়, ধবনী এলাকার রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ঐ এলাকার রাস্তাঘাট পানির স্রোতে বিলিন হয়ে নদীর নালায় পরিণত হয়। ৪০-৫০টি বাড়ি পানির স্রোতে ভেঙ্গে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়।
সিন্দুর্না ইউনিয়নের উত্তর সিন্দুর্না, দক্ষিণ সিন্দুর্না, পাঠানবাড়ি, হলদিবাড়ি নামক এলাকার রাস্তাঘাট পানির স্রোতে ভেঙ্গে গিয়ে নদীর নালায় পরিণত হয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়। মেডিকেল মোড়স্থ রেলগেট নামক এলাকার রেললাইনের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ফলে বুড়িমারী-রংপুরগামী রেল যোগাযোগ ৫দিন যাবত বন্ধ রয়েছে। ইউনিয়ন গুলোর আবাদি জমি, পুকুর, মৎস্য খামারের ব্যাপক ক্ষতি হয়। একই অবস্থা হয় পাটিকাপাড়া ও ডাউয়াবাড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা।
বন্যায় বিভিন্ন ক্ষতির কারনে হাতীবান্ধা উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের মোট ক্ষতির পরিমান দ্বারায় কয়েকশত কোটি টাকা।
সরজারের পাশাপাশি এবারের বন্যায় জেলা – উপজেলার আওয়ামীলীগ, বিএনপি ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনগুলো বনার্ত্য মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা প্রতিদিন’ই জেলার বিভিন্ন জায়গায় বানভাসি মানুষগুলো শুকনো খাবারসহ বিভিন্ন ত্রাণ সহায়তা করে যাচ্ছেন।
এবিষয়ে হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউপি চেয়ারম্যান ডাঃ আতিয়ার রহমান বলেন, তিস্তা নদীর বামতীরে সরকার বাধ নির্মাণ না করায় প্রতি বছর বন্যার সময় এই ইউনিয়নটির ব্যাপক ক্ষতি হয়। চেয়ারম্যান হবার পর থেকে আমি বন্যা পরবর্তী সময় নিজের টাকা খরচ করে করেকবার বাধ নির্মাণ করেছি। কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হয় নাই, বন্যার সময় সেই বাধ নদীগর্ভে বিলিন হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, তিস্তা নদীর বামতীরে ৭-৮ কিলোমিটার একটি বাধ নির্মাণ করলে প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ বন্যার কড়াল গ্রাস নদী ভাঙ্গন, আবাদি ফসল বিনষ্ট হবার হাত থেকে রক্ষা পেতো। এছাড়াও তিস্তার বামতীরে একটি বাধ নির্মাণের জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান।
এবিষয়ে হাতীবান্ধা উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ফেরদৌস আলম বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার গুলো তালিকা তৈরি করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এছাড়াও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা গুলোর খুব দ্রুত তা মেরামত করা হবে।
লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ বলেন, জেলায় ত্রাণ তৎপরতার অব্যাহত আছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট গুলো খুবই দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এছাড়াও সেনাবাহিনীর লোকজন অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে মেডিকেল টিমসহ বন্যার্ত পরিবার গুলোকে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে।