noakhali_76679

দৈনিকবার্তা-ঢাকা ২৬ আগস্ট: গত কয়েকদিন ধরে প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি এবং টানা বর্ষণের ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা দিয়েছে বন্যা। প্রতিদিনই প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। এতে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। বন্যার্তদের কাছে এখনও সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ পৌঁছেনি। এতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বন্যার্ত মানুষেরা। আগামী ৭২ ঘন্টায় দেশের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, ফরিদপুর, শরিয়তপুর, রাজবাড়ী ও মুন্সিগঞ্জ জেলার কিছু এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হতে পারে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট, সুনামগঞ্জ, শেরপুর ও নেত্রকোনা জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে এবং সাতক্ষীরা জেলার বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকতে পারে।পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা তথ্য কেন্দ্রের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বুধবার একথা বলা হয়।ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গা-পদ্মা নদীসমূহের পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী ৭২ ঘন্টা পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকতে পারে।আগামী ৪৮ ঘন্টায় সুরমা-কুশিয়ারা নদীসমূহের পানি হ্রাস পাবে এবং তা অব্যাহত থাকবেপানি উন্নয়ন বোর্ডের ৮৫টি পানি মনিটরিং স্টেশনের মধ্যে ৫১টি স্থানে পানি বৃদ্ধি ও ৩৩টি স্থানে পানি হ্রাস পেয়েছে।

১টি স্থানে পানি অপরিবর্তিত রয়েছে। ১৪টি স্থানে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।ঝিনাইগাতী ঃ শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার গত কয়েক দিন যাবৎ বৃষ্টি না থাকায় এবং উজান থেকে পাহাড়ী ঢল বন্ধ থাকায় বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। বন্যা পরিস্থিতি’ কিছুটা উন্নতি হলেও ভাটি এলাকাগুলোর অবনতি হয়েছে। নদীগুলোর পানি কমতে শুরু করলেও নি¤œাঞ্চল গুলোতে পানিবন্দী এলাকার সংখ্যা বাড়ছে। গত ২২ আগস্ট শনিবার উজান থেকে নেমে আসা আকস্মিক পাহাড়ী ঢলের পানির তোড়ে রাস্তা-ঘাট, ব্রীজ-কালভার্ট, ভেঙ্গে এ উপজেলা বিধ্বস্ত জনপথে পরিণত হয়েছে।

বিভিন্ন এলাকায় অভ্যান্তরীন যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ আবু বকর সিদ্দিক জানান, বন্যার পানি প্রবেশ করায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো পাঠদানের উপযোগী হয়ে উঠেনি। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুতপা ভট্টাচার্জ জানান, ঢলের পানির তোড়ে সহ¯্রাধীক পুকুর তলিয়ে কোটি টাকা মূল্যের মাছ ভেসে যাওয়ায় মৎস্যচাষীরা এখন চরম বিপাকে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আজিজুর রহমান জানান, ঢলের পানির তোড়ে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রায় ৫শ’ ঘর-বাড়ী বিধ্বস্ত, ১৭টি গবাদিপশুর মৃত্যু, ৩৪টি কাঠের ব্রীজ, ১টি পাকাব্রীজ ও ২শতাধিক কালভার্ট বিধ্বস্ত হয়েছে। নলকুড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান জানান, ঢলের পানির তোড়ে দেয়াল চাপা পড়ে তার ইউনিয়নে একই পরিবারের ৪জনসহ মোট ৫জন আহত হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ কোরবান আলী জানান, প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমির আমনধান ক্ষেত বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে।

উপজেলা প্রকৌশলী ফরিদুল ইসলাম জানান, কাংশা, নলকুড়া, ও ধানশাইল ইউনিয়নে এলজিইডি’র কাচা ও পাকারাস্তা ভেঙ্গে উপজেলার অভ্যান্তরীন সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে বিধ্বস্ত জনপথে পরিণত হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে নি¤œাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ। নদীগুলোতে পানি কমতে শুরু করলেও ভাটি এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি’র অবনতি হয়েছে।

বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ খাবার পানি ও খাদ্যের সংকটসহ গো-খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। সরেজমিনে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, বন্যা কবলিত বিভিন্ন গ্রামের লোকজনের বাড়িতে চুলা জ্বলছে না। শুকনা খাবার খেতে হচ্ছে তাদের। তাদের পারাপার হতে হচ্ছে কলার ভেলা ও নৌকাযোগে। স্থানীয় সংসদ সদস্য একেএম ফজলুল হকের উদ্যোগে যে পরিমাণ ত্রাণ সামগ্রী দেয়া হয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এছাড়া পানিবন্দী এলাকার মানুষের পাশে দাড়ায়নি কেউ। উপজেলা চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বাদশা বন্যাকবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করেন এবং ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন।

মুন্সীগঞ্জ: কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মাওয়া, কনকসার ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম ও চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে উপজেলার ১৬ টি গ্রামের ৬শ পরিবারের হাজারো মানুষ। মাওয়া চৌরাস্তা মাহমুদ পট্টি সহ কনকসার ইউনিয়নের জেলে পাড়া, বেদে পল্লী, বেলদার পল্লীসহ বেশ কয়েকটি এলাকার নিন্মাঞ্চলের মানুষ পানিবন্দী হয়ে আছেপ্রায় ৩ সপ্তাহ এখন নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় আরো ভয়াবহ রুপ ধারণ করছে।

ভোগান্তিতে পরেছে এই এলাকার লোকজন।মেদিনী মন্ডল স্থানীয়রা জানিয়েছেন ছোট ছোট বেশকিছু খাল ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে বলে তারা জানান। কনকসার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, তার ইউনিয়নে বেশ কিছু নিন্মাঞ্চলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ঘোড়দৌড় সেতু থেকে কনকসার ইউনিয়নের পাশ দিয়ে হলদিয়ার গোয়ালিমান্দ্রা পর্যন্ত একটি খাল ছিল। খালটি ভরাট করে বাড়িঘর, মার্কেট ও দোকানপাট নির্মাণ করা হয়েছে। খাল ভরাটের কারণে পানি নিস্কাশনের কোন পথ নেই। তাই সামান্য বৃষ্টিতেই নিম্নাঞ্চলে জলবদ্ধতার সৃষ্টি হয় । এছাড়া গত তিন চার দিনে পানি বেড়েছে প্রায় দের ফুট। ভাগ্যকুল পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী মাওয়া পদ্মা ৬.৪০ সে.মি. পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

কুড়িগ্রাম: কুড়িগ্রামে নদ-নদীর পানি কমতে থাকায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বুধবার ধরলা নদীর পানি ফেরীঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার মাত্র ৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে পাহাড়ি ঢলের পানিতে রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ঢলের পানিতে ৫০টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে।

জিঞ্জিরাম নদীর পানির তোড়ে রৌমারী শৌলমারী সড়কের সুতিরপাড় ও বাবুলের চর নামক স্থানে প্রায় এক কিলোমিটার পাকা রাস্তা ভেঙে গেছে। ঘর-বাড়ি ভেঙে গেছে প্রায় ৪০টি। কুড়িগ্রাম-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো: রুহুল আমিন জানান, পাহাড়ি ঢলের পানিতে বেশকিছু ঘরবাড়ি, শিক্ষা টওতিষ্ঠান ও রাস্তা ভাঙনের কবলে পড়েছে। জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ সহায়তার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছেন।এদিকে মানুষের পাশাপাশি গবাদী পশুর খাদ্য সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। চড়া দামে পশুখাদ্য কিনতে পারছেনা কর্মহীন দরিদ্র দিনমজুর পরিবারগুলো।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল মোত্তালেব জানান, জেলার ৭৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫৩টি ইউনিয়নের ৫৫২ বর্গ কিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হয়েছে। প্রায় ৫০ হাজার পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এ পর্যন্ত ৮০ মে’ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক শওকত আলী সরকার জানিয়েছেন জেলায় ৫৩ হাজার হেক্টর জমির আমন ক্ষেত নিমজ্জিত হয়েছে। ক্ষয়-ক্ষতির নিরুপনের কাজ চলছে।

গাইবান্ধা :গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ সর্বানন্দ গ্রামে ¯্রােতের তোড়ে ভে্েঙ্গ যাওয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ পরিদর্শন করেছেন গাইবান্ধা-১ আসনের সংসদ মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন। এসময় উপস্থিত ছিলেন গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক আব্দুস সামাদ, সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল হাই মিল্টন, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রেজিয়া বেগম, জেলা মহিলা আওয়ামীলীগের যুগ্ন আহবায়ক সৈয়দা খুরশিদ জাহান স্মৃতি।পরে সর্বানন্দ ও বামনড্ঙ্গাা ইউনিয়নে ২০০ বন্যার্ত মানুষের মধ্যে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়।

ফেনী : ফেনীর পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। ফসলের মাঠ থেকেও পানি নেমে গেছে। কিন্তু এখন কৃষকের দুচিন্তা নষ্ট হওয়া রোপা আমন কি ভাবে লাগাবে। গত ২০ আগষ্ট পাহাড়ী ঢলের পানির চাপে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনীয়া নদীর বেড়ি বাঁধের ১৮টি ভাঙ্গন স্থান দিয়ে পািন ঢুকে ফেনীর পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলার ২৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে দুই উপজেলার এক হাজার ৬ শত হেক্টর জমির আমন রোপা ও বীজতলা নষ্ট হয়ে ক্ষতি হয়েছে ৩১ লাখ টাকা। আট শত পুকুরের মাছ ভেসে গিয়ে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে।

২৩ কিলোমিটার পাকা সড়ক নষ্ট হয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়। এতে প্রাথমিক ভাবে মোট প্রায় ১১ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলার দায়িত্বে থাকা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. ফজলুল করিম বলেন, ফুলগাজী উপজেলায় বন্যায় এক হাজার পাঁচ শত পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তিন শত হেক্টর রোপা আমন ও বীজতলা পানিতে তলীয়ে কৃষিতে ছয় লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। চার শত পুকুরের মাছ ভেসে গিয়ে ২৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ১০ কিলোমিটার পাকা সড়ক বন্যার পানিতে নষ্ট হয়ে ৬ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

অপর দিকে পরশুরাম উপজেলায় এক হাজার তিন শত হেক্টর আমন রোপা ও বীজতলা নষ্ট হয়ে কৃষিতে ক্ষতি হয়েছে ২৫ লাখ টাকা, ৪০০টি পুকুরের মাছ ভেসে গিয়ে ক্ষতি হয়েছে ৪০ লাখ টাকা এবং ৭ কিলোমিটার পাকা সড়ক নষ্ট হয়ে ক্ষতি হয়েছে চার কোটি টাকা। তাছাড়া দুই উপজেলায় প্রায় সবগুলি কাঁচা সড়ক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।ফুলগাজী সদর ইউনিয়নের গোসাইপুর গ্রামের কৃষক মো. শহীদ উল্যা বলেন, তিনি প্রায় চার একর জমিতে রোপা আমন লাগিয়েছিলেন। বন্যার পানিতে তার সব রোপা নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে রোপা লাগানোর জন্য তারা কাছে এমকি এলাকায়ও কারো কাছে আমনের চারা বা বীজতলা নেই। তিনি কি ভাবে আবার রোপা লাগাবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রমজান আলী প্রামানিক জানান, দুই দফায় বন্যা ও পাহাড়ী ঢলে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনীয়া নদীর বেড়ি বাঁধের ১৮টি স্থানে ২২০ মিটার এলাকা ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়। পানি শুকানো পর এ গুলো মেরামত করতে প্রায় এক কোটি টাকা লাগতে পারে।

নওগাঁ: নওগাঁয় আত্রাই ও ছোট যমুনা নদীর পানি কমে যাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখনও পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগের জীবনযাপন করছে অন্তত ৫০ হাজার মানুষবুধবার বিকেল ৩টায় আত্রাই নদীর পানি বিপদসীমার ৮০ সেন্টিমিটার থেকে কমে ২২ সেন্টিমিটার ও ছোট যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ২৬ সেন্টিমিটার থেকে কমে ৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছেপানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল থেকেই নদীগুলোর পানি কমতে শুরু করে।

নদীর পানি কমে আসায় বুধবার আত্রাই উপজেলার শাহাগোলা, ভোঁপাড়া, মনিয়ারী, হাটকালুপাড়া ও আহসানগঞ্জ ইউনিয়ন, রানীনগর উপজেলার গোনা ইউনিয়ন এবং মান্দা উপজেলার নুরুল্যাবাদ, কসব ও বিষ্ণপুর ইউনিয়নের বন্যার পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এদিকে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, নদীর পানি কমলেও এখনও আত্রাই ও মান্দা উপজেলার আরো অন্তত ৩০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। এসব গ্রামের অন্তত ১০ হাজার মানুষ বাড়ি-ঘর ছেড়ে বাঁধ ও উঁচু স্থানে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে।আত্রাই উপজেলার বান্ধাইখাড়া টেকনিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রহমান রিজভী জানান, বন্যা দুর্গতদের মধ্যে খাবার ও খাবার পানির তীব্র সংকট চলছে। এখনও বিচ্ছিন্ন রয়েছে এলাকার বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা।

এদিকে নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় জেলার ৩ উপজেলার অন্তত ২ হাজার ২৯০ হেক্টর জমির রোপা আমন, ৬শ হেক্টর জমির বুনা আমন, ১৮০ হেক্টর জমির আউশ ধান এবং ৪৫ হেক্টর জমির শাকসবজি পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছে।পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন জানান, নতুন করে অতিবৃষ্টি ও ঢলের পানি না এলে নদীর পানি কমে বন্যা পরিস্থিতি ৪ থেকে ৫ দিনের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে আসবে।নওগাঁর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মেহেদী-উল-শহিদ জানান, বুধবার আত্রাই, রানীনগর ও মান্দা উপজেলার বন্যা দুর্গতদের সাহায্যার্থে জেলা প্রশাসনের বরাদ্দকরা ৩৮ মেট্রিকটন চাল এবং নগদ ৭৫ হাজারা টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ: উত্তাল যমুনার সুবিশাল জলরাশির গর্জন, অদূরেই নদী তীরের মানুষগুলোর জীবন সংগ্রাম। ভয়াবহ রূপ নেয়া যমুনাকে পরাস্ত করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞার স্পষ্ট ছাপ দেখা গেল এদের চোখে মুখেযমুনার পানি বৃদ্ধি পেয়ে মেঘাই-মাইজবাড়ী পুরাতন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি ছুঁইছুঁই করছে। বাঁধের ওপর কোনমতে মাথাগোঁজার ঠাঁই পেয়েছে বানভাসি মানুষেরা। ৩/৪টি টিনের ছাপড়া ঘর তৈরি করে পরিবার পরিজন নিয়ে কোনমতে জড়াজড়ি করে রাত কাটায় এরা।সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার মেঘাই-মাইজবাড়ী ক্ষতিগ্রস্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর আশ্রয় নেওয়া মানুষেরা জানালেন, যমুনার সঙ্গে শত্রুতা ও শখ্যতা এবং দেনা-পাওনার নানা কথা।

আশি ঊর্ধ্ব বৃদ্ধ দেলবার মন্ডল। ১০/১২ বিঘা সম্পত্তি ছিল তার। রাক্ষুসী যমুনা সবই কেড়ে নিয়েছে। এখন মাথাগোঁজার ঠাঁইটুকো নেই। ঢেকুরিয়া বাঁধের পাশে ভাতিজার বাড়িতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করেন তিনি। ওই বাড়িতে পানি উঠে পড়ায় অসহায় এই বৃদ্ধ আশ্রয় নিয়েছেন ঢেকুরিয়া বিদ্যালয়ের বারান্দায়। বিদ্যালয় মাঠেও উঠে পড়েছে পানি। বৃদ্ধ দেলবার মন্ডল মাথা হাত দিয়ে সারাদিনই বসে থাকেন ওই বারান্দায়। বড় ছেলের দেয়া সামান্য অর্থে কোনো মতে দু-বেলা খেয়ে বেঁচে আছেন এই বৃদ্ধ মেঘাই-মাইজবাড়ী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পাশে একটি কুড়েঘরে বাস করেন কদবানু বেওয়া। বয়স ৯০ এর কাছাকাছি। ছেলে সন্তান নেই। একটি মাত্র মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। এখন ওই কুঁড়েঘরটিতে তিনি একাই থাকেন।

কুঁড়েঘরটিতে যমুনার পানি উঠে যাওয়া আশ্রয় নিয়ছেন পাশে অপর একটি বাঁধে এক প্রতিবেশির ঘরে। চেয়ে-চিন্তেই দুবেলার আহার যোগাড় করছেন তিনি।কৃষি দিনমজুর আবু সামা বাড়ি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ২/৩ ফুট দূরে। যমুনা নদীর পানি তার ঘরে উঠে পড়ায় সামান্য উঁচু বাঁধের উপরই পরিবারসহ অশ্রয় নিয়েছেন তিনি। কাজ না থাকায় তিনি পরিবার নিয়ে খুবই কষ্টে দিনপাত চালাচ্ছেন। অভাব দূর করতে অবশেষে তিনি মাছ ধরার পেশাকে বেছে নিয়েছেন।এই বাঁধে আশ্রয় নেওয়া ওসমান খান, শাহ আলী ও শিল্পী খাতুনসহ শতাধিক মানুষের এখন করুন অবস্থা।

এদের মধ্যে প্রায়ই দরিদ্র থেকে হতদরিদ্র। শ্রমজীবী এসব মানুষের কাজ না থাকায় অর্ধাহারে-অনাহারে দিনাতিপাত করছে বলে তারা জানিয়েছেন। এছাড়া বিশুদ্ধ পানি সংকট দেখা দিয়েছেমঙ্গলবার সকালে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বেশকিছু পরিবারকে ১০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়। এতে অনেকে কিছুটা স্বস্তি প্রকাশ করেন। তবে এ চাল দিয়ে ক’দিন চলবে, আর বন্যার পানি ক’দিন থাকবে এ নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন বানভাসি এসব মানুষ।কাজিপুর সদর ইউপি সদস্য আব্দুস সামাদ জানান, ২০০৫ সালে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে সংস্কার করা হয়নি। এ কারণে প্রতি বছর দফায় দফায় বন্যা হয়ে এ অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়।ভোলা: নদী আমাগো সব কাইড়া নিছে। টাকা নাই, পয়সা নাই এখন কোথায় আশ্রয় নিবো।

ছেলে-মেয়েদের কি খাওয়াবো, কি পড়াবো, রাস্তায় ওপর কোনো রকমে পড়ে আছি। কান্না জড়িত কণ্ঠে এ কথাগুলো বলছিলেন নদী তীরের বাসিন্দা গৃহবধূ নাজমা (৩০)তিনি জানান, স্বামী-সন্তান নিয়ে অভাবের সংসার তাদের। কিন্তু নদী ভিটাহারা করে একেবারে পথে বসিয়েছে দিয়েছে, এখন আর কোনো কূল কিনারা নাইভাঙা ঘর-দুয়ার নিয়ে রাস্তার পাশে আশ্রয় নিয়েছেন আরেক গৃহবধূ কুলসুম। নদী ভাঙনে একমাত্র সম্বল হারিয়ে এখন তার আশ্রয় খোলা আকাশের নিচে।কুলসুম জানায়, তার স্বামী আব্বাস আলী জেলে। খেয়ে না খেয়ে কোনো রকম দিন কাটে তাদের। কিন্তু রাক্ষুসি মেঘনা মাথা গোঁজার শেষ ঠাঁই টুকুও কেড়ে নিয়েছে। এখন আর নতুন করে ঘর তোলার সামর্থ্য নাই তাদের।

ভোলার মেঘনার ভয়াল ভাঙনে ভিটাহারা নাজমা ও কুলসুমের মত শত শত পরিবার ঠিকানা হারিয়ে আজ নিঃস্ব হয়ে গেছেন। কোথায় আশ্রয় নিবেন তা বলতে পারছেন না তারা। কেউ কেউ খোলা আকাশের নিচে রাস্তার পাশে অবস্থান নিয়ে অনিশ্চিয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ঠিকানাহারা পরিবারগুলো যেন কিছুতেই ঘুরে দাঁড়াতে পারছেননা।ভোলা সদরের ইলিশা পয়েন্ট দিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরো চার কিলোমিটার এলাকায় ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। চড়ার মাথা থেকে পুরাতন ফেরিঘাট পর্যন্ত পুরো সড়ক ধসে গেছে। ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) চেষ্টা করলেও কোনো কাজ হচ্ছেনা।

ভাঙনের তীব্রতা বেশি থাকায় হমুকির মুখে পড়েছে জংশন বাজার, ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, একটি মাছের ঘের, একটি পুলিশ ফাঁড়িসহ পাঁচটি ইউনিয়ন।নদীর গতি পরিবর্তন ও বেশ কয়েকটি গোল সৃষ্টি হওয়ার ফলে এ ভাঙনের তীব্রতা অনেক বেশি বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে। তারা বলছেন, ভাঙন রোধে নির্ধারিত সময়ে ব্যবস্থা নিলে এতো বড় ধরনের বিপর্যয়ের মধ্যে তাদের পড়তে হতো না।সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পানির স্রোতের সঙ্গে বড় বড় পাড় নদীতে ধসে পড়ছে। জোয়ারের সময় একটু কম হলেও ভাটায় অতিরিক্ত ধস হচ্ছে। নদীর তীরের মানুষ ঘরভিটা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সময়ও পাচ্ছেননা।

একদিকে নদীর ভাঙন চলছে, অন্যদিকে তীরের মানুষগুলো তাদের ঘরের আসবাসপত্র সরিয়ে ফেলছেন। সহায় সম্বল হারা পরিবারগুলো নতুন আশ্রয়ের খোঁজে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।এদের মধ্যে ফাতেমা, হাসিনা, জরিনা ও রাজিয়া জানান, নিজেদের জমি বলতে যা ছিলো তা মেঘনা কেড়ে নিয়েছে। এখন নতুন করে আশ্রয় খুঁজছি। অন্য কোথাও জমি কেনার সামর্থ্য নেই। তাই টাকা-পয়সার অভাবে খোলা আকাশের নিচে কিংবা সড়কের পাশেই ঝুপড়ি ঘর বানিয়ে দিন কাটাতে হবে। এতো দুর্দশায় থাকলেও সরকার তাদের কোনো খোঁজ খবর নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তারা।

ভাঙন কবলিত ইসমতআরা ও ইমন জানায়, এ পর্যন্ত সাতবার নদীতে তাদের ঘর ভেঙেছে, এতে বহুটাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এবার বাকিটুকুও সর্বনাশি মেঘনা কেড়ে নিয়েছে তাদের।আর নতুন ঘর বানানোর সামর্থ্য নেই ঘরভিটা হারিয়ে পথে আশ্রয় নিয়েছেন জয়নাল ফরাজী, আ. বারেক শহিদ, আনিছ মাঝিসহ অসংখ্য পরিবার। সন্তানদের নিয়ে তারা নতুন আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন।এদিকে, ভাঙন কবলিত দু’টি এলাকায় কাজ করছে ভোলা সেবা সংঘ ও অগ্রদুধ সংস্থা নামের দু’টি সেচ্চাসেবী সংগঠন।

সংগঠনের পক্ষ থেকে ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।ভোলা সেবা সংঘের চেয়ারম্যান মুন্সি ওবাদুল্লাহ রতন ও অগ্রদুধ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক জানান, মেঘনার ভাঙনের কারণে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩৬টি পরিবার ভিটা-হারা হয়েছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে সাহায্য সহযোগিতার ব্যবস্থা করবো।ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল হেকিম বলেন, ভাঙন রোধে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ভাঙনের কারণ নির্ণয়ে বিশেষজ্ঞ দলকে ভোলায় আসতে বলা হয়েছে।

ফরিদপুর: পদ্মা ও আড়িয়ালখাঁ নদীতে বন্যার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ফরিদপুরের তিন উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের নিচু এলাকা ডুবে গেছে।পদ্মা নদীতে পানির স্বাভাবিক সীমা হলো ৮ দশমিক ৬৫ মিটার। আজ তা বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ৪ মিটার। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র বলছে, পদ্মার পানি এখন বিপদসীমার ৩৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।উজান থেকে বন্যার পানি নেমে আসায় এই পরি¯ি’তির সৃষ্টি হয়েছে।প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, কয়েকশ’ লোকের বাড়িঘর ডুবে যাওয়ায় তারা পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বাসসকে জানান, এখন পর্যন্তও পরি¯ি’তি তেমন মারাত্মক নয়। তারা পরি¯ি’তি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।তিনি আরো জানান, এই অঞ্চলে বন্যার সময় নিচু এলাকায় ডুবে যাওয়া একটি সাধারণ ঘটনা এবং এলাকাবাসী তা মোকাবেলায় অভ্যস্ত। তবে প্রশাসন প্রয়োজনে পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছে।